ফটক খোলা থাকলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত

রিমা কনভেনশন সেন্টারের মূল ফটক কিছু সময় বন্ধ আবার কিছু সময় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে মনে করেন চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে বড় মেজবান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। তাঁর বলেন, সেদিন পুলিশ ও আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব ছিল। যেসব অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার সাধারণ মানুষের আগমন ঘটে, সেখানে কখনোই মূল ফটক একমুহূর্তের জন্যও বন্ধ রাখা উচিত নয়। ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির কারণেই পদদলিত হয়ে সেদিন মানুষ মারা যায়।

ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোমবার বেলা সোয়া একটার দিকে রিমা কনভেনশন সেন্টারের মূল ফটক বন্ধ ছিল। তখন বাইরে সরু ও ঢালুপথে কয়েক হাজার মানুষ ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ ফটক খোলা হলে একসঙ্গে হাজারো মানুষ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। প্রচণ্ড ভিড়ের চাপ ও হুড়োহুড়িতে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন নিহত ও আহত হন অন্তত ৫০ জন।

প্রাণহানির ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি নগর পুলিশও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এটি নাশকতা কি না, এই অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ ওই সময়ের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানায়, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এই ঘটনা ঘটে। পরে ভিডিও ফুটেজ বিভিন্ন গণমাধ্যমকেও সরবরাহ করা হয়।

অন্তত ১০টি বড় মেজবান পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে চট্টগ্রামের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ব্যবসায়ী আবুল হাসনাতের। গত সোমবার মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানি উপলক্ষে আয়োজিত ১৪টি মেজবানের মধ্যে একটির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। নগরের জিইসি মোড়ের কে স্কয়ার কমিউনিটি সেন্টারের ওই আয়োজনে ছয় হাজার মানুষকে খাওয়ানো হয়। তিনি বলেন, এর আগে সর্বোচ্চ ১২ হাজার লোকের মেজবান পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। কোনো কমিউনিটি সেন্টারে মেজবান হলে এর প্রতিটি ফটক উন্মুক্ত রাখতে হয়। রিমার আয়োজনে ফটক একবার বন্ধ রেখে আবার খুলে লোকজন ঢোকানোর সিদ্ধান্ত ছিল চরম ভুল। এ ধরনের অনুষ্ঠানে বানের পানির মতো লোকজন আসে। খাওয়ার জন্য একটি চেয়ারের পেছনে তিন-চারজনও দাঁড়িয়ে থাকেন। অভিজ্ঞতার অভাবে রিমায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তবে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার আগে রিমা কনভেনশন সেন্টারের ভেতরে বিপুল মানুষ ছিল। ফটক উন্মুক্ত রাখা হলে ভেতরে অনুরূপ দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল।

বড় মেজবানে চট্টগ্রামে সাধারণ একটি কমিউনিটি সেন্টারে ৫ থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত লোক খাওয়ানো হয়। এমনকি গত সোমবারও নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় কিং অব চিটাগাংয়ে কুলখানির মেজবানে ২০ হাজার মানুষকে আপ্যায়িত করা হয়। রিমা ছাড়া ১৩টি কমিউনিটি সেন্টারের সব ফটক উন্মুক্ত ছিল।

মেজবান আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলেন, রিমার ফটক উন্মুক্ত রাখা আরও জরুরি ছিল। কারণ, এর প্রবেশপথ ঢালু ও বিপজ্জনক।

রিমা কনভেনশন সেন্টারের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সাহাব উদ্দিন ডেকোরেটার্সের মালিক সাহাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ফটক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাকে আয়োজকদের। হঠাৎ ফটক খোলার সঙ্গেই হাজারো মানুষ ঢুকতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

রিমার মেজবানে আয়োজনে যুক্ত চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী প্রথম আলোকে বলেন, ফটক খোলা থাকলে ভেতরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতো।

আয়োজকেরা জানায়, গত সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত তিন ব্যাচে রিমা কনভেনশন সেন্টারে ২ হাজার ২০০ লোককে খাওয়ানো হয়। রিমার পশ্চিম দিকের ফটক খুলে ওই তিন ব্যাচের লোক ঢোকানো হয়েছিল। ওই দিন বেলা সোয়া একটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লোকজনের ভিড় তেমন ছিল না। তখন ফটক খোলা ও বন্ধ করা নিয়ে সমস্যা হয়নি। কিন্তু বেলা সোয়া একটার দিকে কনভেনশন সেন্টারের বাইরে তিন হাজারের মতো লোক ছিল। তখন ফটকটি বন্ধ ছিল। চতুর্থ ব্যাচের লোকজনকে ভেতরে ঢোকানোর সময় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

মেজবানে পদদলিত হয়ে আহত হওয়া প্রিয়জিৎ বরণ বৈদ্য প্রথম আলোকে বলেন, রিমা কনভেনশন সেন্টারের মূল গেট (ফটক) একবার বন্ধ ও একবার খোলা রাখার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওষুধের দোকানি প্রিয়জিৎ বলেন, সারাক্ষণ রিমার গেট খোলা থাকলে বাইরে মানুষের এত ভিড় হতো না। এত মানুষও মারা যেত না।

Related posts

Leave a Comment